Originally posted in বণিকবার্তা on 11 April 2026

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
এছাড়া জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব এরিয়া স্টাডিজ ডিগ্রি লাভ করেছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো ছিলেন। তার গবেষণায় প্রাধান্য পেয়েছে অর্থনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাত, বিশেষত শিল্পনীতি, আর্থিক খাত, টেকসই উন্নয়ন ইত্যাদি। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, দেশের অর্থনীতিতে এ যুদ্ধের অভিঘাত, জ্বালানিনীতি ও সরকারের করণীয়সহ সংশ্লিষ্ট নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এক মাসের বেশি সময় ধরে চলার পর বর্তমানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর সামগ্রিকভাবে কী প্রভাব পড়েছে?
বাংলাদেশের ওপর এ যুদ্ধের প্রভাব বহুমুখী। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। তবে জ্বালানির বাইরে গিয়েও এর প্রভাব রয়েছে, কারণ যুদ্ধটি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। ফলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। আবার গালফ অঞ্চলের মধ্য দিয়েই আমাদের পণ্য পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়েছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে সরাসরি যে প্রভাবটি দেখা গেছে, তা পরিবহন খাতের ওপরই। অকটেন ব্যবহারকারী ব্যক্তিগত যানবাহন, কার ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। একইভাবে ডিজেলচালিত বাস, ট্রাক ও লরিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস প্রয়োজন, যার একটি অংশ এলএনজিনির্ভর। কিন্তু এ সময় এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় শুরুতে সীমিতভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়া গেলেও পরে ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে গিয়ে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়েছে। ঈদের সময় যারা দেশে এসেছিলেন, তারা অনেকে ফিরতে পারেননি। আবার নতুন যারা কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল, তারাও আটকে পড়েছেন। যদিও এখনো রেমিট্যান্সে বড় প্রভাব দেখা যায়নি, তবে সামনের মাসগুলোয় এর প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া ছোট ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবও দেখা গেছে। যেমন ডিজেলের সংকটে হাসপাতালের জরুরি সেবা ব্যাহত হয়েছে, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে ট্রলার যেতে পারেনি, বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রমে সমস্যা হয়েছে, কারণ দেশে প্রায় ১৩ লাখ ডিজেলচালিত পাম্প রয়েছে।
মূলত জ্বালানি এমন একটি উপাদান, যা সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্যের অভাব এবং আমদানিনির্ভরতা বেশি হওয়ায় এ প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে। অন্যদিকে ভারত বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বিকল্প উৎস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কিছুটা কম প্রভাবিত হয়েছে।
দুই সপ্তাহ শেষে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি শান্ত হবে বা কোন দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন?
আমার প্রথম উপলব্ধি হলো, এ যুদ্ধে ইরান যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মুসলিম বিশ্ব থেকে ইরান যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছে অথবা ইরান যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাতে যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি আর পূর্বের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যাবে না। জাহাজ চলাচল হয়তো চালু থাকবে, কিন্তু যে রাজনৈতিক পরিবেশ আগে ছিল, তার বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। এ ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অস্থিরতা জিইয়ে রাখতে পারে। যেকোনো সময় নতুন শর্ত বা নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জিসিসি (গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলো এরই মধ্যে জ্বালানি পণ্য পরিবহনের বিকল্প রুট নিয়ে ভাবছে, যেমন রেড সি (লোহিত সাগর) দিয়ে জ্বালানি পরিবহন। এক্ষেত্রে শুধু সৌদি আরব নয়, কাতার, ওমান, কুয়েত, ইরাক—সবাই বিকল্প পথ নিয়ে চিন্তা করছে। বিশেষ করে তারা যতটুকু না ভাবছে মার্কিন বা অন্য যারা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে তাদেরও এক ধরনের চাপ রয়েছে হরমুজ প্রণালির বিকল্প ভাবনা ঘিরে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এ এলাকার ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট যথেষ্ট পরিবর্তিত হবে। সুতরাং হরমুজ প্রণালি আর যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাবে বলে মনে হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে আমরা গ্রিন এনার্জি ও জ্বালানি বৈচিত্র্যের কথা বলছি। কিন্তু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল যুদ্ধ কি দেখাচ্ছে যে আমরা এখনো স্থানীয় ও বৈশ্বিক পরিসরে উল্লেখযোগ্যভাবে সেদিকে এগোতে পারিনি?
দেখুন, ক্রিকেটে একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে গেলে আমরা বিভিন্ন সময়ের ভিত্তিতে দেখি—পাঁচ বছরের পারফরম্যান্স, এক বছরের পারফরম্যান্স, আবার শেষ ছয় মাসের পারফরম্যান্স। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও যদি আপনি পাঁচ বা দশ বছরের গড় পারফরম্যান্স দেখেন, তাহলে মনে হবে অগ্রগতি খুবই সীমিত। কিন্তু যদি সাম্প্রতিক এক বছরের পারফরম্যান্স দেখেন, তাহলে দেখবেন অগ্রগতি অভূতপূর্ব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নেট মিটারিংয়ের আওতায় গ্রিড-সংযুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ গত এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সুতরাং পারফরম্যান্স মূল্যায়নে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের পাশাপাশি সাম্প্রতিক অগ্রগতিও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে এটাও সত্য, আমরা এখনো এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। এর পেছনে অনেক ধরনের পক্ষ জড়িত। যে কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে অন্য অনেক দেশের সফলতা থাকার পরও আমরা সমভাবে যেতে পারিনি।
এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে চাই—কেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আমরা উতরে যেতে পারছি না।
এর প্রধানতম কারণ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার এখনো পরিষ্কার নয়। আমরা সত্যিকার অর্থে জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে চাই কিনা—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর নেই। অতীতে এ প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে সহানুভূতি বা জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে গ্রিন সোসাইটি, মিনি-গ্রিড, মাইক্রো-গ্রিডের কথা বলা হলেও ক্ষমতায় এসে প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচিতে এসবের কোনো উল্লেখ দেখা যায়নি। ফলে প্রথম বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের অঙ্গীকার ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, মূল বাধা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এ কাঠামোর ভেতরে যারা কাজ করেন, তাদের স্বার্থ ও দক্ষতা—দুটিই এ জ্বালানি ঘিরে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি একটি স্বাভাবিক প্রতিরোধ তৈরি হয়। এমনকি নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য গঠন করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অনেক সময় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয় না। বরং সেখানে কাজ করতে গেলে নিরুৎসাহিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়। তৃতীয়ত, আর্থিক প্রণোদনা ও স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে বড় অংকের অর্থ লেনদেন হয়, যেখানে কমিশন ও ব্যক্তিগত সুবিধার সুযোগ থাকে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে গেলে দীর্ঘ সময়, জটিল প্রক্রিয়া এবং তুলনামূলক কম আর্থিক প্রণোদনা থাকে। এ বাস্তবতায় কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান সহজে জীবাশ্ম ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে আগ্রহী হয় না।
চতুর্থত, ভোক্তা পর্যায়ে কোনো চাপ নেই। কারণ ভর্তুকির কারণে মানুষ তুলনামূলক কম দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেলেই সন্তুষ্ট থাকে—তা নবায়নযোগ্য থেকে আসছে, না জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু সরকারের উচিত ছিল দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়া। কারণ বর্তমানে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং পেট্রোবাংলা—দুটি প্রতিষ্ঠানই বড় অংকের ঋণের বোঝা বহন করছে, যার মূল কারণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা। শুধু এপ্রিল থেকে জুন—এ তিন মাসেই জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে। অথচ বিকল্প উৎস তৈরি করার সুযোগ ছিল।
পঞ্চমত, প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতি বড় বাধা। শিল্প খাত এখন নিজ উদ্যোগে রুফটপ সোলার স্থাপন করতে আগ্রহী। কিন্তু নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন পেতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঘুসের দাবি করা হয়। ফলে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন—নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধিতে সমস্যা প্রযুক্তির নয়। প্রযুক্তি কার্যকর, পরীক্ষিত এবং বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। সমস্যা হলো আমরা প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করছি না; বরং অপব্যবহার করছি এবং স্বার্থগোষ্ঠীর জন্য সুযোগ তৈরি করছি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ। জ্বালানি খাতের শীর্ষ ও প্রযুক্তিগত পদগুলোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দক্ষতা সম্পন্ন লোক নিয়োগ দেয়া হয় না। অধিকাংশই জীবাশ্ম জ্বালানি বা প্রচলিত প্রকৌশল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসেন। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত খাতেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সবশেষে, ব্যক্তিগত স্বার্থও বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সরকারি কর্মকর্তা অবসরের পর আইপিপি বা বিদ্যুৎসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। ফলে তাদের মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত স্বার্থ কাজ করে, যা বিদ্যমান কাঠামো পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ পুরো কাঠামোটি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে এটিকে সহজে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নেয়া সম্ভব নয়—যতক্ষণ না ওপর থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আসে।
এসব সমস্যা কমবেশি জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। আবারো জ্বালানি সংকট এই প্রথম তীব্র হয়েছে এমন নয়। এর পরও কেন আমরা সেই অভিজ্ঞতা থেকে বের হতে পারছি না?
এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, কারণ আমরা অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় অভ্যস্ত। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার সক্ষমতা বা মানসিকতা আমাদের নেই। একই সঙ্গে আমাদের একটি ‘ভুলে যাওয়ার প্রবণতা’ রয়েছে—সংকট কেটে গেলে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি না, কাঠামোগত পরিবর্তনও করি না।
বাস্তবে যা প্রয়োজন ছিল, তা হলো সরকার যেন সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলো সমান্তরালে এগিয়ে নেয়। আমরা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে বারবার বলেছি, সরকার যেন একটি ‘রোলিং প্ল্যান’ নিয়ে এগোয়। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে এক/দুই/তিন মাসের পরিকল্পনা থাকবে, কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
সরকার কিছুটা চেষ্টা করছে, কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নানা লবি ও স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ কাজ করে। তারা ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, একটি লবি বলছে, আমাদের দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানো উচিত। কিন্তু আমরা বড়পুকুরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কয়লা উত্তোলনে পরিবেশগত ক্ষতি, জমি ও বসতি ধ্বংস, জলাধারের সমস্যা—এসব বড় ঝুঁকি তৈরি করে। ওপেন-পিট মাইনিং করলে ব্যাপক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর ক্লোজড-পিটে দক্ষতা কম। ফলে এটি বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। অন্যদিকে আরেকটি লবি এলএনজি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলছে—ফ্লোটিং টার্মিনালের বদলে ল্যান্ড-বেইজড অবকাঠামো তৈরির প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে সম্ভাবনা আছে, সেটি ব্যবহার করতে পারলে বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাই অনেকাংশে ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ হিসেবে কাজ করতে পারে। যেমন দেশে প্রায় ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প রয়েছে, যেখানে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ডিজেল আমদানি করতে হয়। এগুলো ধীরে ধীরে সোলারচালিত করা গেলে বছরে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব। পরিবহন খাতে ইলেকট্রিক যানবাহন বাড়ানো গেলে আরো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় হবে। শিল্প খাতে রুফটপ সোলার ব্যবহারেরও বড় সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ চাহিদা কমিয়ে (ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্ট) জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে—স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বাড়ানোর নামে আবারো জ্বালানিনির্ভরতা বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হবে।
এ যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিকভাবে খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হচ্ছে—যুদ্ধরত দেশগুলোর কী কোনো দায়বদ্ধতা বা ক্ষতিপূরণ দেয়ার মতো বিষয় থাকা উচিত?
আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এ যুদ্ধের কারণে এলএনজি ঘাটতি তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও বিনিময় হারে দীর্ঘমেয়াদি (দুই থেকে পাঁচ বছর বা তার বেশি) প্রভাব ফেলবে। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হলেও আমাদের মতো দেশগুলো সহজে এর প্রভাব থেকে বের হতে পারবে না। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কার্যকর বৈশ্বিক প্লাটফর্ম প্রায় নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। এ সময়ে আমরা দেখিনি ওআইসি, আরব লিগ, ডি-এইট বা সার্কের শক্ত কোনো ভূমিকা। জাতিসংঘও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারেনি। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো আরো অসহায় হয়ে পড়ছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ মুসলিম বিশ্বের ভেতরকার ঐক্যকেও দুর্বল করেছে। তাই প্রথম প্রয়োজন—এ দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা পুনর্গঠন করা। দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষ থেকে একটি যৌথ দাবি তোলা উচিত—যেসব যুদ্ধে তারা সরাসরি পক্ষ নয়, সেসব যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে যেন ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকে।
কিন্তু এটা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, যেখানে যুদ্ধ থামাতেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ?
এটা সত্য যে ক্ষতিপূরণের দাবি সহজে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। যে কারণে শুরুতেই বলেছি, ক্ষতিপূরণের দাবি তোলা আসলে এ পুরো প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ। এর আগে আরো কিছু মৌলিক কাজ করা জরুরি। প্রথমত, মুসলিম বিশ্বের ভ্রাতৃত্ববোধ পুনর্গঠন করতে হবে। আমরা যে একটি কমিউনিটির অংশ, একটি আঞ্চলিক প্লাটফর্মের অংশ, একটি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের অংশ—এ জায়গাগুলোকে আবার সক্রিয় ও অর্থবহ করে তুলতে হবে।
এ সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হলে, পারস্পরিক আস্থা তৈরি হলে তখনই আমরা একটি অবস্থানে পৌঁছতে পারব যেখানে সম্মিলিতভাবে বড় ধরনের দাবি তোলা সম্ভব হবে, যেমন যুদ্ধের কারণে আমরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হই। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের যেসব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠন রয়েছে, তাদের ভূমিকাও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ সংকটকালে তারা কী ভূমিকা রেখেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে—এসব বিষয়ে সমালোচনামূলক মূল্যায়ন জরুরি।
সবশেষ, বৈশ্বিক ও স্থানীয় সামগ্রিক পরিস্থিতি যা দেখছেন, তা নিয়ে আপনার চূড়ান্ত মূল্যায়ন জানতে চাই।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে দেশগুলোকে আরো বেশি স্বনির্ভর ও কৌশলগতভাবে প্রস্তুত হতে হবে। বিশ্ব ধীরে ধীরে এক ধরনের এককেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, যেখানে দুর্বল দেশগুলোর জন্য টিকে থাকা আরো কঠিন হবে। তাই আমাদের নিজেদের সক্ষমতা—প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত প্রস্তুতি—বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সম্পদ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্যাসের সম্ভাবনা থাকলে সেটিও যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্য আনা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেন শুধু আমলাতন্ত্রের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে; বরং সিভিল সোসাইটি, প্রাইভেট সেক্টর এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সংকট শুরু হওয়ার পরও আমরা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো সমন্বিত পরামর্শ সভা বা টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ দেখিনি। সংসদে আলোচনা হচ্ছে এটি ইতিবাচক; কিন্তু এর বাইরেও বৃহত্তর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত আলোচনায় আমরা মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু চাহিদার দিক থেকেও জ্বালানি সংকট মোকাবেলার বড় সুযোগ রয়েছে। যেমন এনার্জি-এফিশিয়েন্ট বাল্ব ব্যবহার, আধুনিক এনার্জি টেকনোলজি, এলপিজির বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা, এসির পরিবর্তে ফ্যান ব্যবহারে উৎসাহ, এসব উদ্যোগ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কার্যকর হতে পারে।
তবে সমস্যা হলো যেসব নীতিমালা নেয়া হচ্ছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ের জন্য কার্যকর কাঠামো নেই। যেমন তাপমাত্রা সীমানির্ধারণ বা নির্দিষ্ট সময়ের পর দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ—এসব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল। আরেকটি বড় সমস্যা হলো জ্বালানি খাতের দুর্নীতি, যা নতুন কিছু নয়, বরং দীর্ঘদিনের সমস্যা। বর্তমানে জ্বালানির বাজার বড় হওয়ায় দুর্নীতির পরিমাণ, ধরন ও পরিসর আরো বেড়েছে। এখানে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে—ডিজিটাল ট্র্যাকিং, রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং ট্রেসিং সিস্টেম চালু করা। পাকিস্তান ও ভারত এরই মধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে।
কিন্তু দেশে জ্বালানি আমদানি থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত একাধিক ধাপে দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি ধাপই যেন একটি আলাদা দুর্নীতির হাব হিসেবে কাজ করে। এ হাবগুলো বন্ধ করতে হলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে ডিজিটালাইজ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ডিপো, ফিলিং স্টেশন, এমনকি আমদানিকারক—অনেকেই স্বচ্ছতা বাড়াতে আগ্রহী নয়। ফলে এক ধরনের সমন্বিত স্বার্থগোষ্ঠী এ অস্বচ্ছ কাঠামো বজায় রাখছে। সবাই মিলে যেন এক ধরনের ভাগযোগের রাজনীতি পরিচালিত করছে।



